বালির নামকরণের ইতিহাস

                  বালির ব্রিজ                                                   ফটো সৌজন্যে :-ইন্টারনেট                  

                                                                                             

 শিবানী ভট্টাচার্য বন্দ্যোপাধ্যায় , হাওড়া :

হাওড়ার বালির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমৃদ্ধির ইতিহাস। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি : "কাগজ-কলম কালি/ তিন নিয়ে বালি"। বেশ মনে পড়ে ছোটবেলায় এর অর্থ প্রথম আমাকে বুঝিয়েছিলেন আমার ছোটো কাকা - সাধক শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্য। বলা বাহুল্য,  এর অর্থ বোঝার পর বেশ ভালো লেগেছিল। মনে মনে বেশ গর্ববোধ করেছিলাম। 


  পান্নালাল ভট্টাচার্য                          ফটো সৌজন্যে :-ইন্টারনেট

আসলে এই বালির সঙ্গে আমাদের পরিবারের শিকড়ের যোগ। আমাদের পরিবারের পুরুষোত্তম - বহুভাষাবিদ এবং যোগ-ভক্তি মার্গের সিদ্ধসাধক ভাদুড়ী মহাশয় অর্থাৎ মহর্ষি নগেন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য এই স্থান। এখানে বালি হাইস্কুলে তিনি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইনি লঘিমা সিদ্ধ যোগী হিসেবে পৃথিবী বিখ্যাত। যোগবলে ইনি শূন্যে ভাসমান অবস্থায় থাকতে পারতেন। এর বিবরণ আছে পরমহংস যোগানন্দের আত্মজীবনী - 'Autobiography of a Yogi'-র সপ্তম অধ্যায় - 'The Levitating Saint '-এ। সনন্দলাল ঘোষের রচিত গ্রন্থ 'মেজদা'-তেও এই ঘটনার বর্ণনা আছে। পরমহংস যোগানন্দ পশ্চিমে যাত্রার আগে এই ভাদুড়ী মহাশয় বা মহর্ষি নগেন্দ্রনাথের  আশীর্বাদ গ্রহণ করেছিলেন। পরমহংসদেবের আত্মজীবনীতেই এর বিবরণ আছে। 


 মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ ও পরমহংস যোগানন্দ  ফটো সৌজন্যে :-ইন্টারনেট

এই মহর্ষি নগেন্দ্রনাথের পিতার নাম ছিল পার্বতীচরণ ভাদুড়ী। পার্বতীচরণ ভাদুড়ীর ভ্রাতা কালীচরণ ভাদুড়ী ছিলেন প্রখ্যাত সেতার ও এস্রাজ বাদক সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের পিতা। সুরেন্দ্রনাথ - ভট্টাচার্য উপাধিতে ভূষিত হন। তাই ভাদুড়ী হলেও সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যই ব্যবহার করতেন। 


   সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের     ফটো সৌজন্যে :-ইন্টারনেট

এই সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য আমার ঠাকুরদা। তাঁর তিন পুত্র বাংলা সংগীত জগতের তিন কিংবদন্তি - আমার পিতৃদেব সুরকার প্রফুল্ল ভট্টাচার্য, আমার মেজ কাকা - প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং আমার ছোট কাকা - সাধক শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্য। আজও বালি এঁদের জন্য গর্ব অনুভব করে। 


প্রফুল্ল ভট্টাচার্য , ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য ও পান্নালাল ভট্টাচার্য      ফটো সৌজন্যে :-ইন্টারনেট


সেই বালিরই নামকরণ নিয়ে তাই লেখাটা আমার কাছে বেশ আনন্দের। গর্বেরও। 

এই বালির নামকরণ প্রসঙ্গে নলিনচন্দ্র মিশ্র তাঁর 'বালী গ্রামের ইতিহাস' গ্রন্থে লিখেছেন:

"নাম পরিচয়েও জানা যায় যে বালীগ্রাম নদীগর্ভ সম্ভূত। বালী খালধারের “মনসাদহ” ডমুরদহ (ডুমুরদ্বীপ), চাকদহ (চক্রদ্বীপ), প্রভৃতি “দহর” মত, মনসা-দ্বীপই বুঝায়। “দিগ্বিজয় প্রকাশে" বালীর নাম “বালুকা” ( বালি) বলিয়াই উক্ত হইয়াছে। পশ্চিমা ভড়নৌকার দাডী-মাঝী পূর্ব্বাপর “বালুখাল” (বালিয়া মাটি গ্রামের খাল) বলিয়া আসিতেছে। বালীর দক্ষিণাংশ বেলুড়ের সাবেক “বেলুড়িয়া" "বেলুড্যা” “বেলুডি” নামের অর্থ বালুয়াড়ি বা বালিয়াড়ি ( বালির আলি বা আডরি বা আড়া)। অতএব বালি, বালিয়াড়ি, দ্বীপ এই তিনটির একত্র সমাবেশ সমন্বয়ে নদীর চর বা দ্বীপ বুঝাইয়া সম্ভবতঃ বালুকা বাহুল্যে 'বালি' নাম সার্থক করিতেছে।"

উল্লেখ্য,এই নলিনচন্দ্র মিশ্রের লেখা থেকেই জানা যায় একসময় উত্তরে "কোতরঙ্গ" পর্যন্ত বালির বিস্তৃতি ছিল। উত্তরপাড়াও একসময় বালিরই উত্তরপাড়া ছিল।

বালির নামকরণ প্রসঙ্গে নলিনচন্দ্র মিশ্রের মতের কথা বললাম।  তবে এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি মত প্রচলিত আছে। অনেকেই বলেন, বালু দত্ত নামক কোনও এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম থেকে এই বালি নামটি এসেছে। আবার কেউ কেউ বলেন, রাজা ক্ষিতিশূরের কাছ থেকে বেদগর্ভের অন্যতম পুত্র কুমার বসবাসের জন্য যে বালি নামক স্থানটি পেয়েছিলেন - সেদিনের সেই স্থানই এই বালি। আমার পিতৃদেবের কাছ থেকেও আমি এই মতটির কথা শুনেছি। আরও একটি মতের কথাও এই কথার ইতি টানতে গিয়ে বলি - অনেকেই বলেন জেমস বালির নাম থেকে এই স্থানের নাম বালি হয়েছে। এই বিভিন্ন প্রচলিত মত থেকেই স্পষ্ট - এই নামকরণের প্রসঙ্গে বিচার-বিশ্লেষণ এবং গবেষণার প্রয়োজন আছে।

Comments

Popular posts from this blog

পায়রাডাঙ্গায় চিত্র প্রদর্শনী

বছরের প্রতিটি দিনই হোক পরিবেশ দিবস